শারীরিক ব্যায়াম রচনা । Essay on Physical Exercise । প্রতিবেদন রচনা

মানবদেহের একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদা হলো শারীরিক সক্রিয়তা। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ফিটনেস গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমাদের শরীর এমনভাবে গঠিত নয় যে এটি দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় বা অলস অবস্থায় থাকতে পারে। শারীরিক ব্যায়াম বা শরীরচর্চা কেবল পেশি গঠনের মাধ্যম নয়; এটি মানবদেহের প্রতিটি কোষ, অঙ্গ ও তন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকরী, প্রাকৃতিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়।
বর্তমান প্রযুক্তি-নির্ভর যুগে মানুষের কায়িক শ্রম যখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, তখন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই।

Table of Contents

শারীরিক ব্যায়াম এবং সাধারণ শারীরিক কাজের মধ্যে পার্থক্য

অনেকেই দৈনন্দিন হাঁটাচলা বা ঘরের কাজকে ব্যায়াম বলে মনে করেন। যদিও এগুলো শারীরিক সক্রিয়তা (Physical Activity), কিন্তু বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞায় এগুলোকে পরিপূর্ণ ব্যায়াম (Physical Exercise) বলা যায় না।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
বৈশিষ্ট্যের ধরনসাধারণ শারীরিক কাজ (Physical Activity)শারীরিক ব্যায়াম (Physical Exercise)
সংজ্ঞাপেশির সংকোচনের ফলে সৃষ্ট যেকোনো নড়াচড়া, যেখানে ক্যালরি খরচ হয়।একটি পরিকল্পিত, সুগঠিত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক শারীরিক কার্যক্রম।
উদ্দেশ্যদৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করা (যেমন- ঘর মোছা, সিঁড়ি ভাঙা, বাজারে যাওয়া)।শারীরিক ফিটনেস, শক্তি, সহনশীলতা বা নমনীয়তা বৃদ্ধি করা।
তীব্রতা (Intensity)সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত এবং প্রয়োজনভিত্তিক।নিয়ন্ত্রিত, নির্দিষ্ট সময় ধরে এবং ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়ানোর সুযোগ থাকে।
ফলাফলক্যালরি খরচ হয়, তবে কার্ডিওভাসকুলার বা পেশির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় না।হার্ট রেট বাড়ে, পেশির টিস্যু মজবুত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ফিটনেস অর্জিত হয়।

ব্যায়ামের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিপূর্ণ ও সুষম ফিটনেস রুটিনে প্রধানত চার ধরনের ব্যায়াম থাকা আবশ্যক। প্রতিটি ব্যায়ামের শরীরের ওপর আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রভাব রয়েছে।

১. অ্যারোবিক বা কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম (Aerobic Exercise)

অ্যারোবিক শব্দের অর্থ হলো ‘অক্সিজেনের উপস্থিতিতে’। এই ধরনের ব্যায়ামে শরীরের বৃহৎ পেশিগুলো ছন্দোবদ্ধভাবে কাজ করে এবং হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসকে অধিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করে।
  • উদাহরণ: দ্রুত হাঁটা (Brisk walking), দৌড়ানো, সাঁতার কাটা, সাইক্লিং করা, স্কিপিং বা দড়ি লাফ।
  • সুবিধা: হার্ট রেট বাড়ে, রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয়, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা (Lung capacity) বৃদ্ধি পায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত থাকে।

২. অ্যানারোবিক বা স্ট্রেন্থ ট্রেনিং (Anaerobic / Strength Training)

পেশির শক্তি ও আকার বৃদ্ধির জন্য এই ব্যায়াম করা হয়। এখানে বাহ্যিক কোনো ওজনের (Resistance) বিরুদ্ধে পেশিকে কাজ করতে হয়।
  • উদাহরণ: ভারোত্তোলন (Weightlifting), পুশ-আপ, পুল-আপ, স্কোয়াট (Squats), রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ওয়ার্কআউট।
  • সুবিধা: পেশির ঘনত্ব বাড়ে (Hypertrophy), হাড়ের ক্ষয়রোগ (Osteoporosis) প্রতিরোধ হয় এবং শরীরের বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR) বৃদ্ধি পায়, যা বিশ্রামরত অবস্থায়ও ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে।

৩. ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তার ব্যায়াম

বয়স বাড়ার সাথে সাথে পেশি ও জয়েন্টগুলো শক্ত হয়ে যায়। নমনীয়তার ব্যায়াম শরীরের জয়েন্টের রেঞ্জ অব মোশন (Range of Motion) বাড়াতে সাহায্য করে।
  • উদাহরণ: ইয়োগা বা যোগব্যায়াম, বিভিন্ন ধরনের স্ট্রেচিং (Stretching)।
  • সুবিধা: পেশিতে টান লাগা বা ইনজুরির ঝুঁকি কমায়, শরীরের ভারসাম্য ও ভঙ্গি (Posture) উন্নত করে।

৪. ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রক্ষাকারী ব্যায়াম

বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এই ব্যায়ামটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমায়।
  • উদাহরণ: এক পায়ে দাঁড়ানো, তাই চি (Tai Chi), হিল-টু-টো ওয়াক।
Summary Box: একটি আদর্শ ফিটনেস রুটিন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০-৩০০ মিনিট মাঝারি তীব্রতার অ্যারোবিক ব্যায়াম এবং সপ্তাহে অন্তত ২ দিন পেশি শক্তিশালী করার (Strength training) ব্যায়াম করা উচিত।

মানবদেহে ব্যায়ামের বৈজ্ঞানিক প্রভাব (Physiological Impact)

নিয়মিত শরীরচর্চা করলে মানবদেহের ভেতরে জাদুকরী কিছু জৈবিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে।

হৃদযন্ত্র ও রক্তসংবহনতন্ত্রের ওপর প্রভাব

ব্যায়ামের সময় পেশিতে অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে। এই চাহিদা মেটাতে হৃৎপিণ্ড দ্রুত পাম্প করে। নিয়মিত ব্যায়ামে হৃৎপিণ্ডের পেশি (Myocardium) শক্তিশালী হয়। ফলে প্রতিবার পাম্প করার সময় হৃৎপিণ্ড আগের চেয়ে বেশি রক্ত সরবরাহ করতে পারে (Increased Stroke Volume)। এটি রক্তনালীতে প্লাক বা চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL) কমিয়ে উপকারী কোলেস্টেরল (HDL) বৃদ্ধি করে।

বিপাকীয় প্রক্রিয়া (Metabolism) এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

ব্যায়াম করার সময় পেশিগুলোর শক্তির জন্য গ্লুকোজ প্রয়োজন হয়। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে কোষগুলোর ইনসুলিন সেনসিটিভিটি (Insulin Sensitivity) বেড়ে যায়। অর্থাৎ, শরীর খুব সহজেই রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করাতে পারে। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক পদ্ধতি।

ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

পরিমিত ব্যায়াম শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells) এবং অ্যান্টিবডিগুলোর সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীর খুব দ্রুত যেকোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ শনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যায়ামের ভূমিকা

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যায়ামের প্রভাব চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক প্রমাণিত সত্য।
  • এন্ডোরফিন নিঃসরণ (Endorphin Release): ব্যায়াম করার পর মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয়, যাকে প্রাকৃতিক ব্যথানাশক বা ‘ফেল-গুড’ (Feel-good) হরমোন বলা হয়। এটি তাৎক্ষণিকভাবে বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়।
  • কর্টিসল নিয়ন্ত্রণ: মানসিক চাপের প্রধান কারণ হলো ‘কর্টিসল’ (Cortisol) হরমোন। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরে কর্টিসলের মাত্রা কমিয়ে আনে।
  • মস্তিষ্কের নতুন কোষ গঠন (Neurogenesis): গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যারোবিক ব্যায়াম মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) অংশে নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা অপরিসীম।

বয়সভেদে শরীরচর্চার নিয়ম ও নির্দেশিকা

ব্যায়াম সবার জন্য উপকারী হলেও বয়সের ওপর ভিত্তি করে এর ধরন ও তীব্রতা ভিন্ন হওয়া উচিত।

শিশু ও কিশোর বয়সীদের জন্য (৫ – ১৭ বছর)

এই বয়সে শরীরের গঠন ও বৃদ্ধি ঘটে। তাই প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার খেলাধুলা (যেমন- দৌড়ানো, ফুটবল, সাঁতার) করা উচিত। এটি তাদের পেশি ও হাড়ের সঠিক বিকাশে সাহায্য করে এবং স্ক্রিন-টাইম বা মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য (১৮ – ৬৪ বছর)

কর্মব্যস্ত জীবনে এই বয়সীদের কার্ডিও এবং স্ট্রেন্থ ট্রেনিংয়ের সমন্বয় করা অপরিহার্য। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪০ মিনিট হাঁটা বা জগিং এবং ২-৩ দিন জিমে বা ঘরে বডিওয়েট ব্যায়াম করা উচিত।

প্রবীণদের জন্য (৬৫ বছর বা তার বেশি)

বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় এবং জয়েন্টে ব্যথা থাকে। তাদের জন্য তীব্র ব্যায়ামের বদলে হাঁটা, যোগব্যায়াম, স্ট্রেচিং এবং ব্যালেন্সিং ব্যায়াম বেশি উপকারী। এটি তাদের পেশির ক্ষয়রোধ করে এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে সাহায্য করে।
Important Notes: সতর্কতা
বয়স্ক ব্যক্তিরা অথবা যাদের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা রয়েছে, তাদের নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শরীরচর্চা নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও সঠিক বিজ্ঞান

ব্যায়াম সম্পর্কে সমাজে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ধারণা প্রচলিত আছে, যা দূর করা প্রয়োজন।
প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা (Myth)বৈজ্ঞানিক সত্য (Fact)
ঘামলেই ওজন কমে বা চর্বি গলে।ঘাম হলো শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রক্রিয়া (Cooling mechanism)। ঘামের সাথে পানি ও খনিজ পদার্থ বের হয়, চর্বি নয়। চর্বি মূলত বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি হিসেবে শরীর থেকে বের হয়।
মেয়েরা ওজন তুললে ছেলেদের মতো পেশিবহুল হয়ে যাবে।নারীদের শরীরে পেশি বৃদ্ধির প্রধান হরমোন ‘টেস্টোস্টেরন’ (Testosterone)-এর মাত্রা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম থাকে। তাই স্বাভাবিক নিয়মে ওজন তুললে মেয়েরা পেশিবহুল হয় না, বরং শরীর সুঠাম ও আকর্ষণীয় হয়।
পেটের ব্যায়াম (Crunches) করলেই পেটের মেদ কমে (Spot Reduction)।শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অংশের মেদ আলাদাভাবে কমানো বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। পুরো শরীরের ফ্যাট পার্সেন্টেজ (Fat percentage) কমালেই নির্দিষ্ট অংশের মেদ কমবে।
ব্যায়াম ছেড়ে দিলে পেশি চর্বিতে পরিণত হয়।পেশি এবং চর্বি সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন টিস্যু। একটি অন্যটিতে রূপান্তরিত হতে পারে না। ব্যায়াম ছাড়লে পেশি সংকুচিত হয় (Atrophy) এবং ক্যালরি খরচ কমায় শরীরে নতুন করে চর্বি জমতে শুরু করে।

শরীরচর্চার সময় অবশ্য পালনীয় সতর্কতা ও ঝুঁকি এড়ানোর উপায়

ভুল নিয়মে ব্যায়াম করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। তাই কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলা অত্যাবশ্যক।
  • ওয়ার্ম-আপ (Warm-up) ও কুল-ডাউন (Cool-down): মূল ব্যায়াম শুরু করার আগে ৫-১০ মিনিট হালকা কার্ডিও বা ডায়নামিক স্ট্রেচিং করে শরীরের তাপমাত্রা ও রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে নিতে হবে। এতে ইনজুরির ঝুঁকি কমে। ব্যায়াম শেষে একইভাবে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কুল-ডাউন করতে হয়।
  • সঠিক ফর্ম বা ভঙ্গি (Proper Form): যেকোনো ব্যায়াম, বিশেষ করে ওজন তোলার সময়, সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ভুল ভঙ্গিতে ব্যায়াম করলে মেরুদণ্ড বা জয়েন্টে মারাত্মক ইনজুরি হতে পারে।
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম (Recovery): পেশি ব্যায়াম করার সময় তৈরি হয় না, বরং ব্যায়ামের পর বিশ্রামের সময় তৈরি হয় (Muscle recovery)। তাই পরিমিত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা) এবং পেশিকে বিশ্রাম দেওয়া অপরিহার্য।
  • হাইড্রেটেড থাকা: ব্যায়ামের সময় ঘামের সাথে প্রচুর পানি ও ইলেকট্রোলাইট শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাই ব্যায়ামের আগে, মাঝে এবং পরে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
পেশিতে ব্যথা (DOMS)
নতুন ব্যায়াম শুরু করলে প্রথম কয়েকদিন পেশিতে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। একে Delayed Onset Muscle Soreness (DOMS) বলা হয়। এটি সাধারণত পেশির মাইক্রো-টিয়ারিংয়ের কারণে হয় এবং ২-৩ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়।

পুষ্টি ও ব্যায়াম: একে অপরের পরিপূরক

শুধুমাত্র ব্যায়াম করে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য বা ফিটনেস অর্জন করা সম্ভব নয়। ফিটনেসের ক্ষেত্রে একটি জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক সূত্র হলো— “ফিটনেস নির্ভর করে ২০% ব্যায়াম এবং ৮০% পুষ্টির ওপর।”
ব্যায়ামের পর ক্ষতিগ্রস্ত পেশি মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন (যেমন- ডিম, মাছ, মাংস, ডাল) প্রয়োজন। ব্যায়ামের শক্তি জোগানোর জন্য জটিল শর্করা বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (যেমন- লাল চাল, ওটস, মিষ্টি আলু) এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকর চর্বি (যেমন- বাদাম, অলিভ অয়েল, ডিমের কুসুম) খাদ্যতালিকায় রাখা বাধ্যতামূলক। অপর্যাপ্ত পুষ্টি নিয়ে কঠোর ব্যায়াম করলে শরীর পুষ্টিহীনতায় ভুগবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।

জাতীয় অগ্রগতি ও অর্থনীতিতে শরীরচর্চার পরোক্ষ অবদান

একজন সুস্থ নাগরিক একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। শরীরচর্চার সাথে জাতীয় স্বার্থের একটি গভীর ও অদৃশ্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
  • চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস: একটি দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন করে, তবে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্থূলতার মতো নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCDs) এর প্রাদুর্ভাব কমে যাবে। এতে জাতীয় স্বাস্থ্যখাতের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ লাঘব হবে।
  • কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি (Productivity): সুস্থ ও সবল জনশক্তি কর্মক্ষেত্রে অধিক উৎপাদনশীল হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ কর্মীদের অনুপস্থিতির হার (Absenteeism) কম থাকে, যা দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
  • সুশৃঙ্খল সমাজ গঠন: খেলাধুলা ও শরীরচর্চা মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, দলগত কাজ (Teamwork) এবং সহনশীলতা শেখায়। তরুণ সমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে রাখতে ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (People Also Ask)

১. প্রতিদিন কতক্ষণ ব্যায়াম করা উচিত?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ থাকার জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট (অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০-৩০ মিনিট) মাঝারি তীব্রতার ব্যায়াম করা উচিত।
২. ওজন কমানোর জন্য কোন ব্যায়াম সবচেয়ে ভালো?
ওজন কমানোর জন্য কার্ডিও (দৌড়ানো, সাইক্লিং) এবং স্ট্রেন্থ ট্রেনিং (ভারোত্তোলন) এর সমন্বয় সবচেয়ে কার্যকরী। কার্ডিও দ্রুত ক্যালরি পোড়ায় এবং স্ট্রেন্থ ট্রেনিং মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদে চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
৩. খালি পেটে ব্যায়াম করা কি স্বাস্থ্যকর?
এটি ব্যক্তির লক্ষ্য ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। অনেকে ফ্যাট বার্ন করার জন্য সকালে খালি পেটে কার্ডিও (Fasted Cardio) করেন। তবে ভারী ওজন তোলার ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ১-২ ঘণ্টা আগে হালকা কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার (যেমন- কলা বা ওটস) খেয়ে নেওয়া ভালো।
৪. ব্যায়াম করার সঠিক সময় কোনটি?
ব্যায়াম করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ‘সেরা’ সময় নেই। সকাল, বিকেল বা রাত—যে সময়ে আপনি নিয়মিত এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যায়াম করতে পারবেন, সেটাই আপনার জন্য সঠিক সময়। তবে রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে তীব্র ব্যায়াম করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

উপসংহার

সভ্যতার ক্রমবিকাশ মানুষের জীবনকে করেছে প্রযুক্তি-নির্ভর এবং আরামদায়ক। কিন্তু আমাদের ডিএনএ (DNA) এখনও কায়িক শ্রমের জন্যই কোড করা। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার এই আধুনিক জীবনযাত্রাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা “Sitting is the new smoking” বা নতুন যুগের ধূমপান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
শারীরিক ব্যায়াম কোনো শখ বা সাময়িক ট্রেন্ড নয়; এটি একটি সুন্দর, সুস্থ ও দীর্ঘায়ু লাভের বিজ্ঞানসম্মত বিনিয়োগ। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিটের একটি পরিকল্পিত শরীরচর্চা আমাদের শরীরকে যেমন রোগমুক্ত রাখে, তেমনি মনকে করে সতেজ ও আত্মবিশ্বাসী। তাই একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত জীবন উপভোগ করার জন্য আজ থেকেই আমাদের প্রাত্যহিক রুটিনে শরীরচর্চাকে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত আবশ্যক।

মন্তব্য করুন