মাদার তেরেসা রচনা । Essay on Mother Teresa । প্রতিবেদন রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রশ্নোত্তর

বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মহৎ প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা দেশ, কাল, ধর্ম ও ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র মানবজাতিকে আপন করে নিয়েছিলেন। এমনই এক বিরল ও সর্বজনীন ব্যক্তিত্ব হলেন মাদার তেরেসা (Mother Teresa)। আধুনিক যুগে যখন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, তখন কলকাতার ঘিঞ্জি বস্তি ও ফুটপাতে পড়ে থাকা মৃত্যুপথযাত্রী, অনাথ ও কুষ্ঠরোগীদের বুকে টেনে নিয়ে তিনি ভালোবাসার এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়— “নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।” মাদার তেরেসা তাঁর সমগ্র জীবন এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই অতিবাহিত করেছেন। তিনি কেবল একজন সমাজকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবপ্রেমের এক মূর্ত প্রতীক, যাঁর কাছে আর্তের সেবাই ছিল ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ আরাধনা।

Table of Contents

জন্ম, শৈশব এবং পারিবারিক প্রেক্ষাপট

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মাদার তেরেসার পিতৃভূমি আলবেনিয়া হলেও তাঁর জন্ম হয়েছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের (বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়া) স্কপিয়ে শহরে।
  • জন্মতারিখ ও প্রকৃত নাম: ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি ২৭ আগস্ট তাঁর ব্যাপটিজম বা দীক্ষাস্নানের দিনটিকে প্রকৃত জন্মদিন হিসেবে পালন করতেন। শৈশবে তাঁর নাম ছিল ‘অ্যানিয়েজ গঞ্জা বোইয়াজিউ’ (Anjezë Gonxhe Bojaxhiu)। আলবেনীয় ভাষায় ‘গঞ্জা’ শব্দের অর্থ হলো গোলাপের কুঁড়ি।
  • পারিবারিক পরিবেশ: তাঁর পিতা নিকোলা বোইয়াজিউ (Nikollë Bojaxhiu) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী এবং মাতা দ্রানাফিলে বোইয়াজিউ (Dranafile Bojaxhiu) ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এক নারী।
  • শৈশবের বিপর্যয়: মাত্র আট বছর বয়সে অ্যানিয়েজ তাঁর পিতাকে হারান। পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই দুঃসময়ে তাঁর মা তাঁকে এবং অন্যান্য ভাইবোনদের পরম মমতায় ও কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনে বড় করে তোলেন। মায়ের এই সেবাপরায়ণতা ও ধর্মীয় নিষ্ঠা ছোট্ট অ্যানিয়েজের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ এবং ভারতবর্ষে আগমন

শৈশব থেকেই অ্যানিয়েজ মিশনারিদের জীবনকাহিনি এবং ভারতবর্ষে তাদের সেবামূলক কাজের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাঁর জীবন ধর্মীয় সেবায় উৎসর্গ করবেন।
  • লরেটো সিস্টার্সে যোগদান: ১৯২৮ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত ‘সিস্টার্স অফ লরেটো’ (Sisters of Loreto)-তে একজন সন্ন্যাসিনী হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি ইংরেজি ভাষা শেখেন। সেন্ট তেরেসা অফ লিজিয়্যুর (St. Therese of Lisieux) নামানুসারে তিনি নিজের নাম রাখেন ‘সিস্টার মেরি তেরেসা’।
  • ভারতে পদার্পণ: ১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি ভারতে এসে পৌঁছান। প্রথমে তিনি দার্জিলিংয়ে নবীন সন্ন্যাসিনীদের শিক্ষাকেন্দ্রে (Novitiate) কাজ শেখেন এবং ১৯৩১ সালের ২৪ মে সন্ন্যাসিনী হিসেবে তাঁর প্রথম শপথ গ্রহণ করেন। এরপর তিনি কলকাতার এন্টালি এলাকায় অবস্থিত সেন্ট ম্যারিজ হাইস্কুলে ইতিহাস ও ভূগোলের শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন।

‘কল উইদইন আ কল’: জীবনের মোড় ঘোরানো সেই রেলযাত্রা

সেন্ট ম্যারিজ স্কুলে প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর তিনি শিক্ষকতা করেন এবং ১৯৪৪ সালে সেখানকার হেডমিস্ট্রেস বা প্রধান শিক্ষিকা নিযুক্ত হন। কিন্তু স্কুলের বাইরের কলকাতার বস্তি এলাকার চরম দারিদ্র্য, অনাহার এবং রোগব্যাধি তাঁকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করত। বিশেষ করে ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তর এবং ১৯৪৬ সালের কলকাতার ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার দৃশ্য তাঁর মনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।
১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিশ্রামের জন্য তিনি কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। ট্রেনের কামরায় বসে তিনি এক ঐশ্বরিক অনুভূতি লাভ করেন। মাদার তেরেসা তাঁর দিনলিপিতে একে “Call within a call” (আহ্বানের ভেতর আরেক আহ্বান) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি অনুভব করেন যে, ঈশ্বর তাঁকে লরেটো কনভেন্টের নিরাপদ জীবন ত্যাগ করে কলকাতার সবচেয়ে দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

মিশনারিজ অফ চ্যারিটি প্রতিষ্ঠা: সেবার এক নতুন অধ্যায়

দার্জিলিং থেকে ফিরে তিনি কনভেন্ট ছাড়ার জন্য ভ্যাটিকানের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ভ্যাটিকানের অনুমতি লাভ করেন এবং লরেটোর সন্ন্যাসিনীদের পোশাক ত্যাগ করে নীল পাড়যুক্ত সাদা সুতির শাড়ি পরিধান করা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তাঁর সেবাদলের বিশ্বব্যাপী পরিচায়ক হয়ে ওঠে।
পেশাগত নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিতে তিনি কিছুদিন বিহারের পাটনায় কাটান এবং তারপর কলকাতার মতিঝিল বস্তিতে এসে একেবারে শূন্য হাতে তাঁর কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর তিনি ভ্যাটিকানের অনুমোদন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ (Missionaries of Charity) নামক ধর্মীয় সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।
Important Notes (গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য):
মিশনারিজ অফ চ্যারিটির মূল ব্রত ছিল— “ক্ষুধার্ত, নগ্ন, গৃহহীন, পঙ্গু, অন্ধ, কুষ্ঠরোগী এবং সমাজের সেইসব মানুষের সেবা করা, যারা সমাজ থেকে অবাঞ্ছিত, অবহেলিত এবং ভালোবাসা বঞ্চিত।”

নির্মল হৃদয়: মৃত্যু পথযাত্রীদের আশ্রয়স্থল

১৯৫২ সালে মাদার তেরেসা কালীঘাট মন্দিরের কাছে একটি পরিত্যক্ত ভবনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নির্মল হৃদয়’ (Nirmal Hriday) – মৃত্যু পথযাত্রীদের জন্য এক আশ্রয়স্থল। কলকাতার রাস্তা থেকে মুমূর্ষু ও অসহায় মানুষদের এখানে তুলে আনা হতো। মাদার তেরেসার দর্শন ছিল— যারা সারা জীবন কুকুরের মতো রাস্তায় অবহেলায় কাটিয়েছে, তারা যেন অন্তত মৃত্যুর আগে একজন মানুষের মতো ভালোবাসা ও মর্যাদা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারে।

নির্মল শিশুভবন এবং শান্তিনগর (কুষ্ঠাশ্রম)

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া অনাথ ও পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য তিনি ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নির্মল শিশুভবন’।
তৎকালীন সমাজে কুষ্ঠরোগীদের চরম ঘৃণা ও অস্পৃশ্যতার চোখে দেখা হতো। মাদার তেরেসা টিটাগড়ে কুষ্ঠরোগীদের জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কলোনি গড়ে তোলেন, যার নাম দেন ‘শান্তিনগর’। তিনি নিজে নিজের হাতে কুষ্ঠরোগীদের দগদগে ঘা পরিষ্কার করে বিশ্ববাসীকে এক মানবতার অনন্য শিক্ষা দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯ ১৯৭১) এবং মাদার তেরেসার ঐতিহাসিক ভূমিকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাদার তেরেসার নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শরণার্থী হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়।
  • শরণার্থী শিবিরে সেবা: মাদার তেরেসা ও তাঁর মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সন্ন্যাসিনীরা সল্টলেকসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে দিনরাত এক করে কলেরা ও অনাহারে আক্রান্ত হাজার হাজার মানুষের সেবা করেন।
  • বীরাঙ্গনা ও অনাথদের পুনর্বাসন: ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ছুটে আসেন। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নারী (বীরাঙ্গনা), যারা সমাজের ভয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল, মাদার তেরেসা তাদের বুকে টেনে নেন। তিনি ঘোষণা করেন, “এই মেয়েগুলো সম্পূর্ণ নির্দোষ, এদের কোনো পাপ নেই।”
  • বাংলাদেশে শাখা স্থাপন: ১৯৭২ সালেই ঢাকার ইসলামপুরে তিনি তাঁর সেবাকেন্দ্র খোলেন এবং পরবর্তীতে খুলনা, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে অনাথ শিশু ও নারীদের পুনর্বাসনের জন্য ‘শিশুভবন’ স্থাপন করেন।

বিশ্বজনীন বিস্তৃতি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

কলকাতার বস্তি থেকে শুরু হওয়া মাদার তেরেসার এই সেবাযজ্ঞ খুব দ্রুতই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ভেনিজুয়েলা থেকে শুরু করে রোম, তানজানিয়া, এমনকি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কিউবার মতো কমিউনিস্ট দেশগুলোতেও তিনি তাঁর চ্যারিটির শাখা খোলেন। বর্তমানে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির হাজার হাজার কেন্দ্র রয়েছে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং অন্যান্য সম্মাননা

মানবতার কল্যাণে নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মাদার তেরেসাকে সারা বিশ্ব অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত করেছে।
  • ১৯৬২: ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ এবং ফিলিপাইন সরকার তাঁকে এশিয়ার নোবেল খ্যাত ‘র‍্যামন ম্যাগসেসাই’ (Ramon Magsaysay Award) পুরস্কার প্রদান করে।
  • ১৯৭১: পোপ ষষ্ঠ পল তাঁকে প্রথম ‘পোপ জন ২৩তম শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করেন।
  • ১৯৭৯: বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ লাভ করেন মাদার তেরেসা।
  • ১৯৮০: ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’-এ ভূষিত করে।
  • ১৯৮৫: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম’ প্রদান করে।
নোবেল পুরস্কারের অর্থ দান
মাদার তেরেসা প্রথাগত নোবেল ভোজসভা (Nobel Banquet) বাতিল করার অনুরোধ করেন এবং সেই ভোজসভার জন্য বরাদ্দকৃত ১,৯২,০০০ মার্কিন ডলার ভারতের দরিদ্র মানুষের সাহায্যে দান করে দেন।

সমালোচনা এবং বিতর্ক: ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন

যেকোনো ঐতিহাসিক ও বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের মতোই মাদার তেরেসার কাজ নিয়েও বিভিন্ন মহলে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মতে, এই সমালোচনাগুলো এড়িয়ে গেলে তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  • চিকিৎসা ব্যবস্থার মান: প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ক্রিস্টোফার হিচেন্স (Christopher Hitchens) এবং বেশ কিছু মেডিকেল জার্নাল (যেমন- The Lancet) অভিযোগ তুলেছিল যে, ‘নির্মল হৃদয়’-এ মুমূর্ষু রোগীদের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা বা ব্যথানাশক (Painkillers) দেওয়া হতো না। সেখানে চিকিৎসার চেয়ে ধর্মীয় সান্ত্বনার ওপর বেশি জোর দেওয়া হতো।
  • গর্ভপাত ও জন্মনিয়ন্ত্রণে বিরোধিতা: একজন কট্টর ক্যাথলিক খ্রিস্টান হিসেবে মাদার তেরেসা গর্ভপাত (Abortion) এবং কৃত্রিম জন্মনিয়ন্ত্রণের কড়া বিরোধী ছিলেন। ১৯৭৯ সালের নোবেল বিজয়ী ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আজকের বিশ্বে শান্তির সবচেয়ে বড় ধ্বংসকারী হলো গর্ভপাত।” আধুনিক মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা তাঁর এই রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
  • তহবিলের উৎস নিয়ে বিতর্ক: হাইতির স্বৈরশাসক জঁ-ক্লদ দুভালিয়ার (Jean-Claude Duvalier) এবং চার্লস কিটিংয়ের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণের কারণেও তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন।
মূল্যায়ন: সমালোচকদের জবাবে তাঁর সমর্থক ও জীবনীকাররা যুক্তি দেন যে, মাদার তেরেসা আধুনিক হাসপাতাল তৈরি করতে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিল রাস্তায় পড়ে থাকা নিঃস্ব মানুষদের মৃত্যুর আগে একটু উষ্ণতা, ভালোবাসা ও মানবিক মর্যাদা প্রদান করা, যা তিনি সফলভাবেই করেছিলেন।

মহাপ্রয়াণ এবং সেন্টহুড (Saint Teresa) লাভ

দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ম্যালেরিয়া এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভোগার পর, ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৮৭ বছর বয়সে কলকাতার মাদার হাউসে এই মহীয়সী নারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ভারত সরকার তাঁকে একজন রাষ্ট্রনায়কের সমতুল্য সম্মান জানিয়ে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (State Funeral) তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে কলকাতার মাদার হাউসেই সমাহিত করা হয়।
সন্ত বা সেন্ট (Saint) উপাধি লাভ:
ক্যাথলিক চার্চের নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মাদার তেরেসার নামে দুটি ‘অলৌকিক আরোগ্য’ (Miracle) ভ্যাটিকান কর্তৃক প্রমাণিত হয়। ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে পোপ ফ্রান্সিস এক বিশাল জনসমুদ্রে মাদার তেরেসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সেন্ট তেরেসা অফ ক্যালকাটা’ (Saint Teresa of Calcutta) বা ‘কলকাতার সন্ত তেরেসা’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

সাধারণ জ্ঞান: মাদার তেরেসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও সাধারণ জ্ঞান অন্বেষণকারীদের জন্য মাদার তেরেসা সম্পর্কিত নির্ভুল তথ্য নিচে একটি সারণিতে তুলে ধরা হলো:
তথ্যের ধরনবিস্তারিত তথ্য
প্রকৃত নামঅ্যানিয়েজ গঞ্জা বোইয়াজিউ (Anjezë Gonxhe Bojaxhiu)
জন্ম ও জন্মস্থান২৬ আগস্ট ১৯১০, স্কপিয়ে (বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়া)
ভারতে প্রথম আগমন১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি (প্রথমে দার্জিলিংয়ে)
ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ১৯৪৮ সালে
প্রতিষ্ঠিত সংঘের নামমিশনারিজ অফ চ্যারিটি (Missionaries of Charity) – ১৯৫০
মৃত্যু পথযাত্রীদের আশ্রয়স্থলের নামনির্মল হৃদয় (কালীঘাট, কলকাতা)
নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ১৯৭৯ সালে
ভারতরত্ন উপাধি লাভ১৯৮০ সালে
মৃত্যুতারিখ ও স্থান৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭, কলকাতা, ভারত
সন্ত বা সেন্ট (Saint) হিসেবে স্বীকৃতি৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (ভ্যাটিকান সিটি কর্তৃক)

উপসংহার: বিশ্বমানবতার ইতিহাসে মাদার তেরেসার প্রাসঙ্গিকতা

মাদার তেরেসা কোনো জাদুকর বা আধুনিক চিকিৎসার পথপ্রদর্শক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাধারণ নারী যাঁর হৃদয়ে ছিল অসাধারণ মানবপ্রেম। বর্তমান যুগে, যেখানে মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতা ও যুদ্ধবিগ্রহে মত্ত, সেখানে মাদার তেরেসার জীবন ও দর্শন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়, বরং একটু ভালোবাসা ও সহমর্মিতার।
তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি হলো— “আমরা পৃথিবীতে বড় কোনো কাজ করতে পারি না, আমরা কেবল অনেক ভালোবাসা দিয়ে ছোট ছোট কাজ করতে পারি।” মাদার তেরেসা তাঁর নীল পাড় সাদা শাড়িতে এমন এক মানবতার বীজ বপন করে গেছেন, যা ধর্ম, বর্ণ ও কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে আজও অগণিত সমাজকর্মী ও মানুষের মনে অনুপ্রেরণার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ সেবিকার অবদান মানব ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন