শিশু শ্রম রচনা । Essay on Child labor । প্রতিবেদন রচনা

যেকোনো দেশ ও জাতির টেকসই ভবিষ্যৎ এবং জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) নির্ভর করে সে দেশের শিশুদের সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষিত হয়ে বেড়ে ওঠার ওপর। কিন্তু যখন একটি শিশুর হাতে বই-খাতা বা খেলনার বদলে হাতুড়ি, কাস্তে বা কারখানার ভারী যন্ত্রপাতি তুলে দেওয়া হয়, তখন কেবল একটি শৈশবই বিপন্ন হয় না, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।
শিশুশ্রম (Child Labor) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জটিল আর্থসামাজিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত সমস্যা। এটি দারিদ্র্যের যেমন একটি অন্যতম কারণ, তেমনি দারিদ্র্যের সরাসরি ফলাফলও বটে। সভ্যতার চরম উৎকর্ষের এই যুগে এসেও শিশুদের অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হওয়া একটি জাতির মানবিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ দেয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোতে শিশুশ্রম একটি মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, যা নিরসন করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জন করা অসম্ভব।

Table of Contents

শিশু এবং শিশুশ্রম: আইনি ও আর্থসামাজিক সংজ্ঞা

শিশুশ্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে ‘শিশু’ এবং ‘শিশুশ্রম’-এর আইনি ও প্রায়োগিক সংজ্ঞা স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ, একটি শিশুর করা সব ধরনের কাজই ‘শিশুশ্রম’ হিসেবে গণ্য হয় না।

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আইনে শিশুর বয়সসীমা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনে শিশুর বয়সসীমা ভিন্নভাবে নির্ধারিত হলেও একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে।
  • জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC, 1989): এই সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো মানবসন্তানকে ‘শিশু’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে এই সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে।
  • বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮): বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কাউকে কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইনে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ‘কিশোর’ (Adolescent) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যারা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে হালকা কাজ করতে পারবে।
  • জাতীয় শিশুনীতি, ২০১১: এই নীতিতেও ১৮ বছরের কম বয়সী সকল ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শিশুশ্রম বনাম শিশুর হালকা কাজ (Child Labor vs. Child Work)

সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু অধিকার কর্মীদের মতে, ‘শিশুশ্রম’ এবং ‘শিশুর কাজ’-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
Important Note (গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য):
পরিবারের কৃষি কাজে বা গৃহস্থালি কাজে বাবা-মাকে সামান্য সাহায্য করা, যা শিশুর স্বাস্থ্য, পড়াশোনা ও শারীরিক বিকাশে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না—তাকে ‘শিশুর কাজ’ (Child Work) বলা হয়। এটি শিশুর সামাজিকীকরণের অংশ হতে পারে।
অন্যদিকে, যে কাজ শিশুর শৈশব কেড়ে নেয়, শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে—তা-ই হলো ‘শিশুশ্রম’ (Child Labor)।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের বর্তমান চালচিত্র

শিশুশ্রম কেবল তৃতীয় বিশ্বের বা উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়; উন্নত বিশ্বেও এটি ভিন্ন রূপে বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমের একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে।
  • পরিসংখ্যানগত অন্তর্দৃষ্টি: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৬ কোটি (১৬০ মিলিয়ন) শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত, যা বিশ্বব্যাপী মোট শিশুর প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৭ কোটি ৯০ লাখ শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে (Hazardous work) নিয়োজিত।
  • খাতভিত্তিক বিস্তার: বৈশ্বিক শিশুশ্রমের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষিখাতে (যেমন- তামাক, কোকোয়া, কফি ও রাবার বাগানে) নিয়োজিত। আফ্রিকায় রপ্তানিযোগ্য ফসলের খামারে, দক্ষিণ আমেরিকায় খনি ও ইটভাটায় এবং এশিয়ায় পোশাক ও উৎপাদনমুখী শিল্পে শিশুদের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।
  • উন্নত বিশ্বের নীরব শিশুশ্রম: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও কৃষিখাতে, বিশেষ করে অভিবাসী বা জাতিগত সংখ্যালঘু পরিবারের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়া আধুনিক ‘গিগ ইকোনমি’ বা অনানুষ্ঠানিক খাতেও পশ্চিমা বিশ্বে শিশুশ্রমের নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের স্বরূপ

জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিশুশ্রমের বিস্তার অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর সাম্প্রতিক জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু প্রত্যক্ষভাবে শিশুশ্রমে জড়িত, যার একটি বড় অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রমের প্রাদুর্ভাব

বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক খাতে (যেমন- বড় গার্মেন্টস বা কর্পোরেট কারখানা) আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের (Buyers) কঠোর নজরদারির কারণে শিশুশ্রম অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে (Informal Sector) এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
রাস্তার হকার, চায়ের দোকান, রিকশা গ্যারেজ, লেদ মেশিন কারখানা, বাস-টেম্পুর হেলপার এবং বাসা-বাড়ির গৃহভৃত্য হিসেবে অসংখ্য শিশু কাজ করছে। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো আইনের নজরদারির বাইরে থাকায় শিশুরা এখানে চরম শোষণের শিকার হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম: বিপন্ন শৈশব (Hazardous Child Labor)

বাংলাদেশ সরকার ৪৩টি কাজকে শিশুদের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
  • ট্যানারি বা চামড়া শিল্প: বিষাক্ত রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ ও স্পর্শে শিশুরা চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভোগে।
  • ওয়েল্ডিং ও অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ: চোখের সুরক্ষা ছাড়া কাজ করার ফলে অনেক শিশু দৃষ্টিশক্তি হারায় এবং ভারী ধাতুর আঘাতে পঙ্গুত্ব বরণ করে।
  • বিড়ি ও তামাক কারখানা: নিকোটিনের বিষক্রিয়ায় শিশুরা খুব অল্প বয়সেই হাঁপানি ও যক্ষ্মার মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
  • গৃহকর্ম (Domestic Work): এটি শিশুশ্রমের সবচেয়ে ‘অদৃশ্য’ রূপ। চার দেয়ালের আড়ালে গৃহকর্মী শিশুরা অমানুষিক শারীরিক, মানসিক এবং অনেক ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, যা বাইরের পৃথিবী জানতে পারে না।

শিশুশ্রমের মূল কারণসমূহ: একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ

শিশুশ্রম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত বেশ কিছু কাঠামোগত ত্রুটির সম্মিলিত ফল।
  • চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব (Vicious Cycle of Poverty): শিশুশ্রমের প্রধান কারণ দারিদ্র্য। পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের বেকারত্ব বা স্বল্প আয়ের কারণে বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে শিশুদের উপার্জনে নামতে হয়। মজার ব্যাপার হলো, সস্তা শ্রম হিসেবে শিশুদের নিয়োগ দেওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের বেকারত্ব আরও বাড়ে, যা দারিদ্র্যের চক্রকে স্থায়ী করে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙন (Climate Refugees): বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস বেড়েছে। সর্বস্বান্ত হয়ে গ্রাম থেকে অসংখ্য পরিবার শহরে পাড়ি জমায় (Urban Migration)। এই ছিন্নমূল পরিবারের শিশুরাই পরবর্তীতে শহরের বস্তিতে থেকে শিশুশ্রমে যুক্ত হয়।
  • সস্তা শ্রমের প্রতি মালিকপক্ষের লোভ: শিশুদের নিয়োগ দেওয়া মালিকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের তুলনায় শিশুদের অর্ধেক বা তারও কম মজুরি দিতে হয়। শিশুরা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারে না, অধিকার নিয়ে দরকষাকষি করতে পারে না এবং খুব সহজেই তাদের ভয় দেখিয়ে বেশি সময় কাজ করানো যায়।
  • শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি ও ব্যয়: অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু থাকলেও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ (খাতা, কলম, গাইড বই, প্রাইভেট টিউশন) কেনা অনেক দরিদ্র পরিবারের সাধ্যের অতীত। এছাড়া, কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষার (Vocational training) অভাবে সাধারণ পড়াশোনা শেষে চাকরির নিশ্চয়তা না থাকায় দরিদ্র পিতামাতারা শিশুদের স্কুলে পাঠানোর চেয়ে ছোটবেলা থেকেই কোনো ‘কাজে’ ঢুকিয়ে দেওয়াকে বেশি লাভজনক মনে করেন।
  • সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অসচেতনতা: সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, ছোটবেলা থেকে কাজ শিখলে শিশু দ্রুত স্বাবলম্বী হবে। এই অজ্ঞতার কারণে শিশুশ্রম সামাজিকভাবে এক ধরনের নিরবচ্ছিন্ন গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেছে।

শিশুশ্রমের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব

অর্থনৈতিক উপার্জনের আশায় শিশুকে কাজে পাঠানো হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জন্য অপরিসীম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১. শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়

শিশুদের পেশি, হাড় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ গঠিত হওয়ার আগেই ভারী কাজ করার ফলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি (Stunting) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিষাক্ত ধোঁয়া, কেমিক্যাল এবং অপুষ্টির কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ (NCDs) নিয়ে বেড়ে ওঠে। অল্প বয়সেই তাদের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

২. মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা

শৈশবের আনন্দ, খেলাধুলা ও বন্ধুদের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত শিশুরা চরম হীনমন্যতা, বিষণ্ণতা ও মানসিক ট্রমায় ভোগে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত গালিগালাজ, শারীরিক নির্যাতন এবং বঞ্চনা তাদের মনস্তত্ত্বকে আক্রমণাত্মক (Aggressive) করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের খারাপ পরিবেশের প্রভাবে শিশুরা মাদকাসক্তি ও কিশোর অপরাধে (Juvenile Delinquency) জড়িয়ে পড়ে।

৩. জাতীয় অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা

সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomy) দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুশ্রম একটি চরম আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। যে শিশু আজ স্কুলে গিয়ে একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার বা আইটি স্পেশালিস্ট হতে পারত, শিশুশ্রমের কারণে সে সারাজীবন একজন অদক্ষ শ্রমিক (Unskilled labor) হিসেবেই থেকে যায়। এর ফলে জাতি তার ভবিষ্যৎ মেধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং দেশের ‘মানবসম্পদ সূচক’ নিম্নমুখী হয়।

শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ

শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু কঠোর আইন ও সনদ রয়েছে।
আইনের নাম / সনদমূল বিষয়বস্তু ও নির্দেশনা
আইএলও কনভেনশন ১৩৮ (Minimum Age Convention)কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক স্কুলিং শেষ করার বয়সের চেয়ে কম হবে না (সাধারণত ১৫ বছর)।
আইএলও কনভেনশন ১৮২ (Worst Forms of Child Labour)দাসত্ব, পাচার, পতিতাবৃত্তি, সশস্ত্র সংঘাত এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার অবিলম্বে নিষিদ্ধ ও নির্মূল করতে হবে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)১৪ বছরের নিচে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। ১৪-১৮ বছর বয়সীরা কিশোর হিসেবে হালকা কাজ করতে পারবে, তবে দিনে সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি, ২০১০দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে সমাজ থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করার কৌশল নির্ধারণ।
Summary Box: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) দ্বারা ঘোষিত ১২ জুন তারিখটি বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ (World Day Against Child Labour) হিসেবে পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনসচেতনতা তৈরি করা।

শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের করণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল

কেবল আইন প্রণয়ন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।
১. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Nets) সম্প্রসারণ: দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা, রেশনিং এবং উপবৃত্তি (Stipend) প্রদানের পরিধি আরও বাড়াতে হবে, যাতে অভাবের তাড়নায় তারা শিশুদের কাজে পাঠাতে বাধ্য না হয়।
২. বাধ্যতামূলক ও কর্মমুখী শিক্ষা: কেবল প্রাথমিক নয়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি ও ভোকেশনাল (Vocational) শাখাকে যুক্ত করতে হবে, যাতে শিশুরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পায়।
৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ ও তদারকি: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-এর তদারকি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত এবং বাসাবাড়িতে শিশু নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR): শিল্পমালিকদের নৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে যে তারা কোনো শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেবেন না। প্রয়োজনে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি (Living Wage) নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের সন্তানদের শ্রমে যুক্ত হতে না হয়।
৫. ভোক্তা সচেতনতা (Consumer Awareness): আমরা যারা ক্রেতা, আমাদের সচেতন হতে হবে। যে পণ্য বা সেবা উৎপাদনে শিশুশ্রম ব্যবহার করা হয়েছে, তা সামাজিকভাবে বর্জন করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (People Also Ask – PAA)

১. বাংলাদেশে শিশুশ্রমের ন্যূনতম আইনি বয়স কত?
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের কিশোর হিসেবে গণ্য করা হয়, যারা কেবল শর্তসাপেক্ষে হালকা কাজ করতে পারে।
২. শিশুশ্রমের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলো কী কী?
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ট্যানারি বা চামড়া শিল্প, লেদ ও ওয়েল্ডিং কারখানা, বিড়ি-তামাক শিল্প, ইটভাটা, ব্যাটারি তৈরি এবং গৃহকর্ম।
৩. শিশুশ্রম নিরসনে আইএলও (ILO)-এর ভূমিকা কী?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম নিরসনে আইনি কাঠামো তৈরি করে (যেমন- কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২)। তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নীতি প্রণয়ন, ডেটাবেজ তৈরি এবং পুনর্বাসন প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
৪. একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি কীভাবে শিশুশ্রম বন্ধে সাহায্য করতে পারি?
প্রথমত, নিজের বাড়িতে বা ব্যবসায় কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। দ্বিতীয়ত, আশেপাশে কোথাও শিশু নির্যাতনের বা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের ঘটনা দেখলে স্থানীয় প্রশাসন বা চাইল্ড হেল্পলাইন (১০৯৮) নম্বরে কল করে অবহিত করুন।

উপসংহার: আগামীর বাংলাদেশ ও সুরক্ষিত শৈশব

“আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার”—এটি কেবল একটি বহুল ব্যবহৃত স্লোগান নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার মূলমন্ত্র। শিশুশ্রম কেবল একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকেই হত্যা করে না, এটি একটি জাতির সোনালি ভবিষ্যৎকে গলা টিপে হত্যা করে। আইন ও নীতিমালার ফাঁকফোকর গলে শিশুদের শোষণ করার যে অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগিতা, তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যম হিসেবে শিশুশ্রম কোনো সমাধান নয়, বরং এটি দারিদ্র্যের স্থায়ীত্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের শিশুদের হাতে হাতুড়ির বদলে বই তুলে দিতে হবে। তাদের শৈশবকে করতে হবে নিরাপদ ও আনন্দময়। রাষ্ট্র, সমাজ, মালিকপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিশুশ্রম নামক এই অমানবিক প্রথার চির অবসান ঘটানো সম্ভব। তবেই বাংলার আকাশে প্রতিটি শিশু মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলতে পারবে এবং গড়ে তুলবে এক আত্মনির্ভরশীল ও মানবিক রাষ্ট্র।

মন্তব্য করুন